২০১১ সালের দিকে। তারিখটা মনে নেই। নোয়াখালি জিলা স্কুল। দিবা শাখা। যতদুর মনে পড়ে টিফিন ব্রেক এর পরে সেকেন্ড ক্লাসটা। ফারহানা ম্যাডামের ক্লাস। ম্যাডাম ক্লাসে আসার পরই সবাই বলল, আর পড়তে পারবো না আজকে। এই ক্লাশটাতে গল্প করি? ম্যাডামও রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, দেখি কেউ একজন গান গাও। পেছনের বেঞ্চ থেকে কয়েকজন বললো, ম্যাডাম ‘প্রতীক’ ভালো গান পারে।(এটাই বলসিলো মনে হয়। প্রতীক গান শিখে- এই কথাটাও হতে পারে। ঠিক মনে আসছে না। স্মৃতিশক্তি খুব একটা ভালো না তো!!) এরপর ডেকে সবার সামনে এনে কালো ফ্রেমের চশমার প্রতীক-কে বলা হলো গান করতে। প্রতীক গাইলো, “পুরোনো সেই দিনের কথা, ভুলবি কি রে! হায় ও সেই চোখের দেখা প্রানের কথা, সে কি ভোলা যায়…”। কেউ কেউ গলা মেলালো তার সাথে।
শিরোনামহীন এর তানজির তুহিন ভাইকে চিনেন তো? ‘আবার হাসিমুখ’ কিনবা ‘ইচ্ছে ঘুড়ি’-র সেই মানুশটা। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে তার কণ্ঠে শিরোনামহীন এর গান গুলোর কথা মনে আছে? সেই ২০০৯ সালের দিকে শিরোনামহীন এর সাথে পরিচয়। সেই সময়টায় যে কয়েকটা গান শুনছিলাম তার মধ্যে ‘পুরোনো সেই দিনের কথা’ গানটাও ছিলো।(এই মুহুর্তেও ব্যাকগ্রাউন্ডে গানটা রিপিট হচ্ছে!!) তুহিন ভাইয়ের কণ্ঠে শেষবার গানটা শিনেছিলাম ২০১০ এর শেষের দিকে। এরপর বৃত্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে ফোন চুরি যাওয়ায় আর শোনা হয় নি। আর নিতেও পারি নি গানটা। তখনকার সময়গুলো তো আজকের মতো ছিলো না।
কয়েক মাস পরের গল্পটাতো বলাই হলো। প্রতীকের কণ্ঠেই কানে আসে গানটা। কোনো ইন্সট্রুমেন্টাল ছাড়াই ছেলেটা গেয়েছিলো। আহ! সে কি গলা। মনে হলো কেউ অদৃশ্য থেকে সুর তুলছে। এরপর দিবা শাখাতে যে একবছর ছিলাম, তাতেই ক্লাসে দুই কি তিনবার গানটা শুনছিলাম তার গলায়। অন্য কোনো গান গাইতেই দিতাম না। বলতাম, ‘পুরোনো সেই…’ গানটা ধর। প্রতীকও গাইতো। আর আমরা মুগ্ধ হয়ে কান পাততাম। স্কুলের কোনো অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য কাউকে খোঁজা লাগতো না। প্রতীক-ই গাইতো সেই অসম্ভব সুন্দর গলা দিয়ে। তীক্ষ্ন সুরে।
প্রতীক এর সেই গান আর সেই দিনগুলো। গল্প করার রসদ তো এইগুলোই। এই পৃথিবীর কিছু কিছু গল্প নির্মমতায় ঠাঁসা। এই গল্পটাও সেই রকম। চাইলে হয়তো ফোনের প্লেলিস্ট থেকে তুহিন ভাইয়ের গলায় গানটা শোনা যাবে। কিন্তু প্রতীকের গলায়? উত্তরটা, না। হ্যাঁ, না-ই। শোনা যাবে না। প্রতীকরা এখন আর কোথাও নেই। না ক্লাসরুম, না আড্ডাতে। অথচ হতে পারতো কি? প্রতীক খুব বড় হতে পারতো। গানের গলাটা আরো ঝালিয়ে নিতে পারতো আড্ডাগুলোকে জীবন্ত রেখে। হয় নি। অন্তত আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ নির্মমতার একটি মনে হচ্ছে এটিকে। “প্রতীকের প্রয়ান হয়েছে কিনবা প্রতীক এইসব দিনগুলিতে আর থাকবে না”- কতো সুন্দর করে লিখে দিলাম, না? না চাইলেও কিভাবে যেনো লেখা হয়ে যায়। অথচ যেটা চাই সেটা ভুল করেও পাই না। চাই, প্রতীকের গলায় আবার গানটা শুনি। শুনতে পাবো না…
মাঝে মাঝে এই পৃথিবীটাকে বিষাদের মতো মনে হয়। “জীবনটা খুব সহজ, মনোগ্রামে দাগ কেটে ফেলে আসা সময়ের মতো”- বলা মানুশগুলোকে খুব করে বলতে ইচ্ছে করে,
-একটু হিসাবনিকাশ করে দিবেন? আমার হিসেবটা হচ্ছে না।
পারবে? পারবে না। জীবনটা আসলে খুব কঠিন। একটা মুহুর্ত অনেকগুলো মুহুর্তকে পাল্টে দেয়। এই যেমন আজকের একটা মুহুর্ত প্রতীক-কে অনেক দূর করে তাড়িয়ে দিলো।
আচ্ছা কেউ এতো সহজে কারোর মায়ায় জড়িয়ে যায় কেনো? আদৌও কেউ কি জানে? জানে না। খুব সম্ভবত সৃষ্টিকর্তা জানে এই উত্তরটা। প্রতীক-টার জন্য এই রাতজাগা সময়ে কেউ উপর থেকে বসে মায়া ধরিয়ে দিয়েছে। জীবনের হিসাবনিকাশ-টাকে আরেকটু জটিল করে দিয়েছে। একটা সময় পর এই হিসাবনিকাশ আরো জটিল হবে। ছেলেটার প্রতি মায়াটাও কেটে যাবে হয়তো। ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বো। মানিব্যাগটার স্বাস্থ্যটা ভালো হবে। শুধু সময়টা না। প্রতীক ছেলেটাও পারতো, ক্যারিয়ার নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে। পারতো, আমাদেরকে পাশে দাঁড় করিয়ে এক কাপ চা খাওয়াতে। পারলো না। সময়টা ছেলেটাকে চিনলো না।
আজকের পর থেকে প্রতীক কোথাও থাকবে না। আড্ডায় থাকবে না, ক্যাম্পাসে থাকবে না। থাকবে না স্কুলের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগীতায় লাল-সবুজ পতাকার পাশে জাতীয় সংগীত গাওয়ার জায়গাতে, না থাকবে এইসব সময়ে। তবুও কেন জানি মনে হয়, প্রতীক থাকবে তার সেই গানটাতে। অনেকটুকু সময় ধরে। এই জীবনে কেউ সময়টাকে পেয়ে নস্ট করে, কেউ নস্ট করার জন্য পেতে চায়, কেউবা জীবনের হিসাবনিকাশটা মেলাতে। প্রতীকরা খুব সম্ভবত শেষটাতে থাকে। হিসাবনিকাশটাকে সহজ করতে চায়। গানটা গেয়ে কিনবা আড্ডাটাকে মাতিয়ে রেখে। হিসাবটা পারলেও নিকাশটা পারে না। সময়টার সাথে পেরে উঠতে উঠতে শেষ হয়ে যায়।
এই পৃথিবীতে সব মানুশের সাথেই শেষ দেখা হয়। প্রতীকের সাথেও হয়েছিলো। ২ বছরের মতো হবে। ক্লাস সেভেনের মাঝপথে প্রাতঃ শাখাতে শিফট হয়েছিলাম। এরপর থেকেই তেমন একটা দেখা হতো না। এইতো কয়েক মাস আগে জিলা স্কুল গিয়েছিলাম কোনো এক কাজে। তখন কাজ সেরে গেট থেকে বের হওয়ার সময় কেউ একজন( মনে হয় প্রীতম) দাঁড় করিয়ে বললো, প্রতীকের তো অসুখ। অনেক টাকা প্রয়োজন। পারলে কিছু দিস। আমি বললাম, আচ্ছা দেখবো। তখন খুব তাড়া ছিলো তাই প্রতীকের অসুস্থতার ব্যাপারে খুব ভালো করে জানা হয় নি। এখন আর জানার প্রয়োজন ও পড়বে না। তারপরও খুব করে মন থেকে চাই এই পৃথিবীতে পুনঃজন্ম বলে যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে সেই জন্মে প্রতীক আসুক। নিকাশটা সেরে নিবে হয়তো। আর তা না পারলে, পরজন্মে স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তাহলে প্রতীকটা সেখানেই থাকুক। খুব ভালো করে। পুরোনো সেই দিনের কথা মনে এনে…
Let's stay in the Loop?
I'll send you updates on new blogs only. No spam!