আজ ২৩ শে জুন। ৭৫ বছর আগে এই দিনটায় ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেনে যে দলটার গোড়াপত্তন হয়েছিলো, শেখ সাহেবের নেতৃত্বে সেই দলটাই দেশের মানুষের হয়ে কথা বলেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। শেখ মুজিব ছিলেন বিদেশের মাটিতে, জেলে। বিদেশের মাটিতে বসে দেশের সুদিনের অপেক্ষায় থাকেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব, তাজউদ্দীন আহমেদ সাহেব, কামরুজ্জামান সাহেব আর ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী সাহেবরা মিলে সবকিছু চালিয়ে নেন। দেশ স্বাধীন হয়, বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন। এসেই বললেন, "আমার দেশের মানুষ কখনোই আমার সাথে বেইমানি করবে না।"
বেইমানি করে এই জাতি তাকে শেষ করে দিয়েছিলো, সাথে তার পুরো পরিবারকেও। মুজিব ভাইকে ফিরে পাওয়ার পর তাজউদ্দীন সাহেবের একটা সুপ্ত বাসনা ছিলো। সেটা হলো, মুজিব ভাই তাকে ডেকে নিয়ে নিরবে নিভৃতে বসে তার কাছে জানতে চাইবেন, যুদ্ধের সময় কিভাবে সবকিছু সামলে নিয়েছেন। তখন জমে থাকা সব কথা তাকে বলবেন। সব শুনে মুজিব ভাই চোখ ভিজিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন, ঠিক যেমনটা তিনি ধরেছিলেন মুজিব ভাই দেশে ফেরার পর। সেই ইচ্ছেটা পূরণ হয় নাই। এক পনেরো আগস্ট সব শেষ করে দিয়েছিলো তাকেও, সাথে তার একান্ত কাছের তিনটা মানুষকেও। যে দল স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে সেই দলটাকেও নিঃশেষ করে দিতে চেয়েছিলো। পারে নাই।
জোহরা তাজউদ্দীন এগিয়ে আসলেন, সাতাত্তরে দলের আহবায়ক হলেন। ছোট্ট সোহেল তাজকে কোলেপিঠে করে সারাদেশ চষে বেড়িয়েছেন। দলটাকে ধরে রেখেছেন। এরমধ্যেই নেত্রী দেশে ফিরলেন। নিভৃতচারী জোহরা তাজউদ্দীন বয়সকে বাধা মানেননি, দলকে গণতন্ত্র উদ্ধারের আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বদানের যোগ্য করে তুলতে গভীর মমতায় পাশে থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে সহযোগিতা করে গেছেন। একসাথে থেকে দলটাকে গুছিয়ে নিলেন, ছিয়ানব্বই এ ভোটে জিতলেন। নেত্রী সরকার গঠন করলেন, দেশের জন্য কাজ করতে থাকলেন।
এরপর একুশে আগস্ট আসলো, দল তখন আর সরকারে নাই। নেত্রী তখন বিরোধীদলীয় নেতা, বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। সাথেই জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ঢাকার তখনকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফসহ সেন্ট্রালের সব নেতারা। আর, ট্রাকের সামনে নিচেই বসা ছিলেন তখনকার মহিলা আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট আইভী রহমান। বক্তৃতা শেষ হবে হবে এমন সময় নেত্রীকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড বিস্ফোরণ, সেকেন্ডেই সব ওলটপালট। ততক্ষণে মঞ্চে থাকা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেন - যাতে তাঁর গায়ে কোন আঘাত না লাগে। নেত্রীর কিছু হতে দেন নাই নেতারা, বিনিময়ে অনেকেই নিজের জীবন দিয়ে দিয়েছেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন আইভী রহমান। যে মানুষটা জীবনে কোনোদিন মঞ্চে বসতেন না, বক্তব্য দিয়েই নিচে গিয়ে কর্মীদের সাথে বসতেন। '২১ আগস্ট ও তাকে ট্রাকের উপরে উঠবার আহ্বান জানান পার্টির তৎকালীন সেক্রেটারি আব্দুল জলিল সাহেব। তিনি যান নাই। বিনিময়ে জীবনটা দিলেন। সহধর্মিণী হারালেন জিল্লুর রহমান সাহেব। নিজে দেশটার জন্মলগ্নে ভূমিকা রেখেছেন, সারাজীবন মানুষের জন্য রাজনীতি করেছেন। সেই সময়ে সাংবাদিকদের বলা জিল্লুর রহমান সাহেবের কথাটা মর্মে গিয়ে আঘাত করে, "দেশটা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আপনারা এনেছেন, মৌলবাদীদের হাতে এভাবে শেষ হতে দিয়েন না।"
শেষ হতে দেন নাই, এক এগারোতে নেত্রী যখন পার্টির লিডিং পজিশনে থাকা নেতাদের সাথে জেলে, সংস্কারপন্থীদের পাশ কাটিয়ে আশরাফুল ইসলাম সাহেব আর সোহেল তাজ সাহেবকে সাথে নিয়ে দলটাকে ধরে রাখলেন। নেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করেছেন।
সৈয়দ আশরাফ সাহেব, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের ছেলে। বাবার পরিচয়ের বাইরেও একেবারে তৃনমূল থেকে উঠে আসা আশরাফ সাহেব। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের জিএস ছিলেন। মনে পড়ছে ১/১১ এর আশরাফ সাহেব, ৫মে রাতের আশরাফ সাহেব। উনি আর জিল্লুর রহমান সাহেব না থাকলে ১/১১ এর পরের আওয়ামী লীগ হয়তো আজকের আওয়ামী লীগ হয়ে উঠতো না। তাঁর সহধর্মিণী গত হয়েছিলেন, বনানীর বাড়িটি বিক্রি করে দিয়েছিলেন স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ যোগাতে। টানা দুই মেয়াদে মন্ত্রী ছিলেন, তাও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে। দীর্ঘদিন ধরে পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই মানুষটার স্ত্রীর চিকিৎসা খরচ যোগাতে বাড়ি বিক্রি করতে হয়। ফেসবুকের দেয়ালে দেখেছিলাম মন্ত্রীসভার সদস্যদের মধ্যে তার মেয়াদের ১০বছরে শুধু একজনের সম্পদ কমেছে এবং সেটা উনিই ছিলেন! উনারলাস্ট কাউন্সিলে বলেছিলেন, "আমি আওয়ামী লীগের সন্তান। আওয়ামী লীগের ঘরেই আমার জন্ম। আওয়ামী লীগ যখন ব্যথা পায়, আমারও কিন্তু হৃদয়ে ব্যথা লাগে। আওয়ামী লীগের এক কর্মী যদি ব্যথা পায়, সেই ব্যথা আমিও পাই। আপনারা এখানে এসেছেন। আপনাদের রক্ত, আমার রক্ত একই। এই রক্তে কোনো পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগকে দল ভাবিনি। আওয়ামী লীগ একটা অনুভূতি।" ২০১৬ তে যখন মন্ত্রিত্বের পরিবর্তন হলো তখনো বলেছিলেন, "আমার রক্তে বেঈমানী নাই!"
নেত্রীর আস্থাভাজন ছিলেন। কতটুকু সত্য জানি না, শুনেছি উনি অসুস্থ থাকায় দলের হাইকমান্ড কিশোরগঞ্জ-১ থেকে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়া যায় কিনা সেটা ভেবে দেখতে বলে তখন নাকি নেত্রী বলেছিলেন, “যতদিন আশরাফ সাহেব থাকবেন, ততদিন সেটা নিয়ে সেকেন্ড টাইম ভাবার দরকার নাই!” কিশোরগঞ্জবাসীকে বলেছিলেন, “যেহেতু সৈয়দ আশরাফ সাহেব অসুস্থ, সবাই মিলে তার জন্য কাজ করে যাবেন, যেন তিনি নির্বাচনে জয়ী হন। সুস্থ হয়ে তিনি যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসেন এই দোয়া করছি।” জয়ীও হয়েছিলেন!
১/১১ এর পর নেত্রী বের হয়ে আসেন, আস্তে আস্তে করে সব নেতারাও। তাদের মধ্যে ছিলেন পার্টির বর্তমান সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের সাহেবও। যিনি পনেরো আগষ্টের হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবাদ করায় গ্রেপ্তার হন। কারাগারে থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের সেন্ট্রালের প্রেসিডেন্ট হন দুইবার। এক এগারোতেও কারাভোগ করেন। মুক্ত হওয়ার পর, শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত তাকে সদ্য সাবেক ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শাহে আলম মুরাদ জড়িয়ে ধরে রাখলেন। সামনেই থাকা সাংবাদিকদের বললেন, "জেলখানা হলো রাজনীতিবিদদের জন্য পাঠশালা। আমি আমার জীবনের সেই পাঠশালা থেকে শিক্ষা নিয়ে এসেছি।"
সেই পাঠশালা থেকে বেরিয়ে এসে, সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় দল আবার জনগণের ভোটে সরকারে আসে।
পত্রিকার ফ্রন্ট পেইজে একটা ছবি, তাতে সফেদ পাঞ্জাবি পড়া একটা মানুষ দুহাত দিয়ে দুজন কর্মীকে বাঁচাচ্ছেন। এদের একজন ছিলেন তৎকালীন মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সভাপতি। নিজে মার খাচ্ছেন, পুলিশ বেধড়ক লাঠিপেটা করছে। মার খাওয়া মানুষটা সোহেল তাজ। এক এগারোর পর দল যখন সরকারে আসে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। আমলাতন্ত্রের কাছে আদর্শ হারিয়ে যেতে বসলেন কিন্তু হারাতে দেন নাই। মাথা উঁচু করে সরে আসেন সরকার থেকে, রাজনীতি থেকে। যেইখানে বেড়ে উঠেছেন সেই কাপাসিয়ায় গিয়ে বললেন, "আমি কখনোই আমার কাপাসিয়ার মানুষের সাথে বেইমানি করতে পারি না, আমার দেশের খারাপ হতে দিতে পারি না। কারণ আমি তাজউদ্দীন সাহেবের ছেলে, তার রক্ত আর আমার রক্ত একই।" একটা জিনিস ভাবেন। সোহেল তাজ সাহেবের বাবা এদেশের জন্মলগ্নের একজন কান্ডারী, তাঁর মা দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। নিজে দুইবারের নির্বাচিত এম পি। তাঁর পর্যায়ের একজন মানুষ ছাত্রলীগের থানা পর্যায়ের একজন নেতাকে সেভ করতে গিয়ে পুলিশের মার খায়। মানুষের সাথে বেইমানি হবে জেনে মন্ত্রীত্ব ছেড়ে দেয়। পার্টির প্রতি, কর্মীর প্রতি, মানুষের প্রতি নেতার কমিটমেন্ট এই ছিল বলেই আওয়ামী লীগ অনুভূতির নাম।
এক এগারোর পর আওয়ামী লীগ আবারো রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেলো, নেত্রী আবার প্রধানমন্ত্রীত্ব পেলেন। পুরো পরিবারকে হত্যা করবার পর, সেই একই শক্তি যখন তাকেও শেষ করে দেয়ার জন্য গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে, ক্ষমতায় এসে তাদেরকে তিনি আইনের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। আদালতে মামলা করেছেন, বিচার চেয়েছেন আদালতের কাছে। ১২বছর ক্ষমতায়, একই কায়দায় গ্রেনেড ছুড়ে না মারলেও, চাইলেই এনকাউন্টারে শেষ করে দিতে পারতেন কাউন্টারপার্টকে। না, তিনি করেন নাই। উলটো কোকো'র মৃতুতে ছুটে গিয়েছেন, দরজা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাঁকে, প্রধানমন্ত্রীকে। না, তিনি কোন প্রতিশোধ নেন নাই। আইভি রহমান, কিবরিয়া সাহেব, আহসানউল্লাহ মাস্টারদের রক্তের দাগ যাদের হাতে ঐ রাজাকারদের সঙ্গী, মৌলবাদী, তার স্ত্রী, তার দুই সন্তানদের রক্ত আর এই রক্ত এক না।
এই রক্ত মুজিব ভাইয়ের রক্ত, এই রক্ত নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, কামরুজ্জামান সাহেবের রক্ত। এই রক্ত কখনোই বেইমানি করতে শিখে নাই। প্রতিহিংসায় কাউকে নিঃশেষ করে দেওয়া শিখে নাই।
শুভ জন্মদিন, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি! বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ। প্লাটিনাম জয়ন্তী তোমার গান গায়... যুগে যুগে এই দলে প্রচুর বেঈমান এসেছে, কালের গহ্বরে হারিয়েও গেছে। কতো রক্ত, হামলা, ষড়যন্ত্রও হয়েছে। কিন্তু নজরুল ইসলাম সাহেব, তাজউদ্দীন আহমদ সাহেব, জোহরা তাজউদ্দীন, জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফ আর সোহেল তাজ সহ আরো অনেকেই এসে দলটাকে আগলে রেখেছেন। সামনে আরো অনেকগুলো বছর আগলে রাখবে তাদের অনুজরা, দলের কর্মীরা। গণমানুষের এই দল রয়ে যাবে দূর্দান্ত প্রতাপে। কারন,
"আওয়ামী লীগ একটা অনুভুতি। আওয়ামী লীগ করা যায় না, হয়ে জন্মাতে হয়।"
Let's stay in the Loop?
I'll send you updates on new blogs only. No spam!